...|...|...

সারাদেশ

মাকে বলেছিলেন সকালে ফিরবেন, ঘুম ভাঙতেই শুনলেন ছেলে আর নেই

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:১৯
Shares
মাকে বলেছিলেন সকালে ফিরবেন, ঘুম ভাঙতেই শুনলেন ছেলে আর নেই

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মোহাম্মদ ইয়াছিন। ছবি: সংগৃহীত

মাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, সবজি নিয়ে টেকনাফ যাচ্ছেন। সকালে বাড়ি ফিরবেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মা শওকত আরার সাথে মোহাম্মদ ইয়াছিনের এটাই ছিল শেষ কথা। তখন পিকআপে সবজি তোলার কাজ চলছিল। ছেলে কোথায়, কী করছে জানতে ফোন করেছিলেন মা। কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যে খবরটি শুনলেন, তা মেনে নেওয়ার মতো নয়। ইয়াছিন আর বেঁচে নেই।

মায়ের কাছে দেওয়া কথা অনুযায়ী সকালে ফিরেছিলেন ইয়াছিন। তবে নিজের পায়ে হেঁটে নয়, ফিরেছিলেন নিথর দেহ হয়ে। মাত্র ১৫ দিন আগে সাত লাখ টাকা দিয়ে কেনা শখের পিকআপটি ঘিরে তার যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, সড়ক দুর্ঘটনায় তা শেষ হয়ে গেল।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া সবুজ পাহাড় এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে একটি বাসের সাথে পিকআপটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইয়াছিনসহ দুজন নিহত হন। ইয়াছিনের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকায় নানাবাড়ির উঠানে রাখা হয়েছিল তার লাশ। শেষবারের মতো ইয়াছিনকে দেখতে সেখানে জড়ো হন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। বাড়ির বারান্দা থেকে ভেসে আসছিল কান্না। স্বজনদের সেই আহাজারির মধ্যে সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠছিল মায়ের বিলাপ।

কান্নায় ভেঙে পড়ে শওকত আরা বারবার বলছিলেন, ‘অ পুত, আঁরে ছাড়ি কেন গেলি গই! ফজরত আইবি হইরে এন গরি ফাঁকি দিলি!’ ছেলেকে হারানোর শোক যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।

একসময় এলাকায় ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন ইয়াছিন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল নিজের একটি পিকআপ হবে। সেই ইচ্ছার কথা মা-বাবাকে জানিয়েছিলেন বারবার। ছেলের আবদার পূরণ করতে ১৫ দিন আগে সাত লাখ টাকা খরচ করে একটি পিকআপ কিনে দেন তারা।

কেনার পর প্রথম ১০ থেকে ১২ দিন পিকআপটি চালিয়েছিলেন একজন নিয়োগ করা চালক। গত বুধবার সেই চালককে সরিয়ে নিজেই গাড়ি চালাতে শুরু করেন ইয়াছিন। ওই দিন একটি ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রামে যান তিনি। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার চকরিয়ায় ফেরেন। রাতে পিকআপে সবজি তুলে টেকনাফের পথে রওনা হন। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ করা হয়নি তার।

ইয়াছিনের লাশ দাফনের পর নানাবাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে বড় বোন জান্নাতুল নাইমা বলেন, সে ইজিবাইক চালাত। মা-বাবার কাছে পিকআপ কিনে দেওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল। ১৫ দিন আগে পিকআপটি কিনে দেওয়া হয়। সেই পিকআপই তার প্রাণ কেড়ে নিল।

চার ভাইবোনের মধ্যে ইয়াছিন ছিলেন তৃতীয়। তার বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেনের বয়স ২৬ বছর। তিনি মালয়েশিয়ায় থাকেন। বড় বোন জান্নাতুল নাইমার বয়স ২২ বছর। আর ১৫ বছর বয়সী ছোট ভাই মোহাম্মদ রবিউল হোছাইন রাজমিস্ত্রির কাজ করে। তাদের বাবা মোহাম্মদ দুলাল লামায় ব্যবসা করেন।

ইয়াছিনদের পৈতৃক বাড়ি বান্দরবানের লামা উপজেলায়। তবে প্রায় ২০ বছর ধরে পরিবারটি চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকায় নানাবাড়িতে বসবাস করছে।

পরিবারের সবার আশা ছিল, নিজের পিকআপ চালিয়ে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হবেন ইয়াছিন। মা-বাবার কাছে আবদার করে কেনা গাড়িটি নিয়ে তার সেই পথচলা শুরু হয়েছিল মাত্র ১৫ দিন আগে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। বাড়ির উঠানে ছেলের নিথর দেহ আর স্বজনদের কান্না যেন এক মুহূর্তেই বদলে দিল পুরো পরিবারের জীবন।

একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৭ বছর বয়সী আবদুল্লাহ। তার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকায়। তার বাবার নাম আবুল কালাম। পিকআপে করে চকরিয়া থেকে বাড়ির পথে ছিলেন তিনি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তার জীবনযাত্রা।

গতকাল বিকেল পাঁচটায় শাহপুরা জামে মসজিদ মাঠে মোহাম্মদ ইয়াছিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পাশের সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

যে মা সকালে ছেলের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তাকেই শেষবারের মতো ছেলেকে বিদায় জানাতে হয়েছে। মাত্র ১৫ দিন আগে সাত লাখ টাকার পিকআপ কেনাকে ঘিরে যে স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল, এক রাতের দুর্ঘটনায় তার পরিসমাপ্তি ঘটল। ইয়াছিনের সাথে শেষ হয়ে গেল একটি তরুণ জীবনের সম্ভাবনা, আর তার পরিবার ডুবে গেল শোকের গভীরে।