...|...|...

চট্টগ্রাম

বান্দরবানের রুমায় হামের উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু

বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, সকাল ১০:৪৪ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৮:০৭
Shares
বান্দরবানের রুমায় হামের উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু

ছবি: টাইমস টুডে

বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গত ১৫ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজন খুমী শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একইসাথে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। দুর্গম এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে বিলম্ব এবং জনসচেতনতার অভাবকে পরিস্থিতি অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

সর্বশেষ সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে চার বছর বয়সী প্রেলুং খুমী বান্দরবান সদর হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। এর আগে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয় রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম লেতং পাড়ায়।

মারা যাওয়া অন্য ছয় শিশু হলো—ফ্রেলে এ খুমী (৯), খ্রেপা খুমী (১৩), শইফ্রা খুমী (১৩), খ্রেতেম এং খুমী (৬), পলি এং খুমী (৭) ও প্রেটেম এং খুমী (৭)।

লেতং পাড়ার বাসিন্দা অংসাই খুমী জানান, নিহত শিশুদের মধ্যে সুইলুং খুমীর নিজের এক মেয়ে ও দুই নাতি রয়েছে। এছাড়া তার দুই ভাইয়ের আরও দুই সন্তান এবং পাড়ার আরেকটি শিশুও মারা গেছে। তিনি বলেন, ছয় শিশুর মধ্যে দুজন হাসপাতালে আনার পথে মারা যায়, বাকিরা পাড়াতেই মারা গেছে। এখন হামের লক্ষণ দেখা দিলে সবাই কষ্ট করে হলেও হাসপাতালে নিয়ে আসছে।

তিনি আরও জানান, লেতং পাড়াটি অত্যন্ত দুর্গম। বগালেকের ‘৭ কিলো’ এলাকা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে সেখানে পৌঁছাতে হয়।

সোমবার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের আইসোলেশন কক্ষে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কারও স্যালাইন চলছে, আবার নতুন রোগীও ভর্তি হচ্ছে।

বগালেকের ফাইনন পাড়ার বাসিন্দা পারিং ম্রো জানান, তার সাত বছর বয়সী মেয়ের জ্বর, গলা ও পেটে ব্যথা এবং শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে রোববার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের রুংরই পাড়ার বাসিন্দা পালে ম্রো জানান, তার ১০ ও ১২ বছর বয়সী দুই সন্তানের পাঁচ দিন ধরে জ্বর ও শরীরে লালচে দাগ ওঠায় তাদেরও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসান জানান, গত ৬ জুন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১০০ শিশু রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ৬৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং বর্তমানে ১৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

হামের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার খুমী ও ম্রো জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিয়মিত টিকা নিতে আগ্রহী নন। টিকাদান কর্মসূচির সময় ডাকলেও অনেকে আসেন না। এছাড়া বাইরে থেকে আক্রান্ত হয়ে গ্রামে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনার পর অনেক পরিবার এখন শিশুদের টিকা দিতে এবং হাসপাতালে নিয়ে আসতে আগ্রহী হচ্ছে।

এদিকে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় রোগী পরিবহনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। মুমূর্ষু রোগীদের প্রায় ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে জিপ গাড়িতে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।

ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটির চাকা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া টানা বৃষ্টিতে সড়কের অবস্থাও খারাপ। হাসপাতালটি মাত্র ১০ শয্যার হওয়ায় রোগীর তুলনায় খাবারের সংকটও দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত খাবারের বরাদ্দ চেয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিজা আক্তার বিথী বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. তৌহিদুল আনোয়ার জানান, বর্তমানে সদর হাসপাতালে হামের আক্রান্ত ২৫ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। গুরুতর অসুস্থ প্রেলুং খুমীর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পথে তার মৃত্যু হয়।

জেলা পরিষদের সদস্য ও স্বাস্থ্য বিভাগের আহ্বায়ক ডা. সানাইপ্রু ত্রিপুরা বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করছে। অ্যাম্বুলেন্স ও খাবারের সংকটের বিষয়টি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে হামের বিস্তার রোধে এক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসান। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে। যেসব দুর্গম এলাকায় শিশুরা টিকা থেকে বাদ পড়েছে বা টিকা নিতে পারেনি, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হবে, যাতে কোনো শিশুই টিকাদান কর্মসূচির বাইরে না থাকে।