লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নেমেছিলেন ১৮ বছর বয়সী আরেক লিওনেল। তিনি লিওনেল বেনজামিন ফ্লোরেস, পরিচিত ‘বেনজা’ নামে। বোকা জুনিয়র্সের একাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণ ফরোয়ার্ডের দ্রুত উত্থান এখন আর্জেন্টাইন ফুটবলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে ক্লাবের মূল দল ও জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়ে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ের ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে প্রায় ১৫ মিনিট খেলেন বেনজা। ম্যাচটি ছিল মেসির বিদায়ী ম্যাচ। এর আগে সেপ্টেম্বরে বলিভিয়ার বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। এরপর সাত দিনের মধ্যে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে চারটি ম্যাচ খেলেন এই তরুণ।
বস্তি থেকে আর্জেন্টিনা দলে
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুয়েনস এইরেসের উত্তরে ভিয়া লা কাভা এলাকার একটি দরিদ্র জনপদে জন্ম বেনজার। মাত্র সাত বছর বয়সে বোকা জুনিয়র্সের একাডেমিতে সুযোগ পান তিনি। এরপর প্রায় ১০ বছর প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় উঠে বাসে করে অনুশীলনে যেতেন।
একাডেমির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন বেনজা। এক ম্যাচে পাঁচ গোল করার পাশাপাশি কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার কৃতিত্বও রয়েছে তার।
গত জুলাইয়ে বোকা জুনিয়র্সের মূল দলের হয়ে অভিষেক হয় তার। কোচ আরুয়াবারেনার আস্থার প্রতিদান দেন গোল করে। এরপর সেপ্টেম্বরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ডাক পান। বলিভিয়ার বিপক্ষে অভিষেকের পর ক্লাবে ফিরে উনিয়ন দে সান্তা ফের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে করেন জোড়া গোল। পরে জাতীয় দলের হয়ে বুরকিনা ফাসো ও বেনিনের বিপক্ষেও খেলেন।
ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ প্রতিভা
বেনজার প্রথম কোচ ক্রিস্তিয়ান বেনিতেস আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ওলেকে তার প্রতিভা সম্পর্কে বলেন, ‘সান ইসিদ্রোর পাড়ার ক্লাব এল সোরসালে পাঁচ বছর বয়সেই ছেলেটি ওভারহেড কিক করত। অনুশীলনে আমার ছেলে বল ছুড়ে দিত আর ও ওভারহেড কিক করত। সব বল জালে জড়াত।’
বেনজাকে নিয়ে নিজের মুগ্ধতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি রিভার প্লেটের সমর্থক। কিন্তু এখন বোকার ম্যাচ দেখি। ভাবুন, আমার কেমন লাগে। আমি দেখি ওর জন্য। এখন ওর গোলে আমিও উদ্যাপন করি।’
রসিকতা করে বেনিতেস আরও বলেন, ‘আমার বাড়িতে যদি কোনো দিন বোকার কোনো জার্সিটা ঢোকে, সেটা শুধু ওরই হবে।’
আক্রমণভাগে বহুমুখী বেনজা
বেনজা মূলত ফরোয়ার্ড। ডান পায়ের শক্তিশালী শট, গতি ও ড্রিবলিং তার বড় শক্তি। উইংয়ের দুই পাশে, স্ট্রাইকার কিংবা মূল স্ট্রাইকারের পেছনে খেলতে পারেন তিনি। নিজের পছন্দের পজিশন সম্পর্কে বেনজা বলেছেন, ৭, ৯, ১০ কিংবা ১১ নম্বর দলের প্রয়োজনে যেকোনো ভূমিকায় খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
তার আদর্শ ফুটবলার লিওনেল মেসি ও হুয়ান রোমান রিকেলমে। একের বিপক্ষে এক লড়াইয়ে দক্ষতা বাড়াতে জেরেমি ডোকু ও জামাল মুসিয়ালার খেলাও নিয়মিত দেখেন তিনি।
স্কালোনির প্রত্যাশা, নজরে ইউরোপের ক্লাব
বোকা জুনিয়র্সের মূল দলের হয়ে ১৮ ম্যাচে চার গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন বেনজা। দ্বিতীয় দলসহ সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৬ ম্যাচে তার গোল ১৩টি, অ্যাসিস্ট সাতটি।
তরুণ এই ফরোয়ার্ডকে নিয়ে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, ‘ফ্লোরেস খুব ভালো করছে। আমাদের ওর যত্ন নিতে হবে। ওর পাশে থাকতে হবে, সমর্থন দিতে হবে। ও আর ফ্রাঙ্কো (মাস্তানতুয়োনো) তরুণ খেলোয়াড়, যারা আমাদের আনন্দ দেবে।’
স্কালোনির বক্তব্যে বেনজাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলার গুরুত্বও উঠে এসেছে। কারণ, অল্প বয়সে দ্রুত সাফল্য পাওয়ার পর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা তরুণ ফুটবলারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাবে বেনজার বর্তমান বাজারমূল্য ৮০ লাখ ইউরো। তাকে ধরে রাখতে বোকা জুনিয়র্স চুক্তির মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। চুক্তিতে দুই কোটি ডলারের রিলিজ ক্লজও রাখা হয়েছে। বেনজা মূল দলে খেলা শুরুর পর থেকে বোকা টানা ১৬ ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে।
ইউরোপের ক্লাবগুলোর আগ্রহের মধ্যে মৌসুম শেষে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা হতে পারে। তবে মেসির বিদায়ী ম্যাচে খেলা কিংবা একই নামের অধিকারী হওয়া দিয়ে বেনজার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই তাকে পরিচয় গড়তে হবে। তিনি ‘পরবর্তী মেসি’ হয়ে উঠবেন, নাকি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত হবেন ‘প্রথম বেনজা’ হিসেবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।


