...|...|...

সারাদেশ

তিন বছরে ১০১ মৃত্যু, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে নিরাপত্তার ঘাটতি

মুহাম্মদ দিদারুল আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৩০ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৩১
Shares
তিন বছরে ১০১ মৃত্যু, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে নিরাপত্তার ঘাটতি

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরুর পর থেকেই অনিরাপদ রেলপথ ও অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর থেকে গত পৌনে তিন বছরে এই নতুন ও পুরোনো রেলপথ মিলে ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

একই সাথে প্রাণ হারিয়েছে একটি বন্য হাতিও। শুধু চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই মারা গেছেন অন্তত পাঁচজন, যার সর্বশেষ শিকার ষোলশহরে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা।

অরক্ষিত ও অবৈধ লেভেল ক্রসিং রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, ১৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ৯৯টি বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি ৭৭টি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, বৈধ ৯৯টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই কোনো গেটম্যান বা নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। ফলে দ্রুতগতির ট্রেন আসার সময় যানবাহন ও পথচারীদের জীবন পুরোপুরি নিজেদের সতর্কতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার অংশে ২৭টি বৈধ ও ৪৭টি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে। অন্যদিকে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০১ কিলোমিটার অংশে ৭২টি বৈধ ও ৩০টি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে, যেখানে ৫৬টি বৈধ ক্রসিংএ কোনো গেটম্যান নেই।

বছরভিত্তিক প্রাণহানির পরিসংখ্যান চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার তথ্যমতে, ২০২৪ সালে এই রুটে ২৭ জন নিহত হন এবং একটি হাতি মারা যায়। এরপর ২০২৫ সালে ৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার আওতায় সব রেলপথ মিলে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৯১ জন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান।

রেলওয়ের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনা রোধে ইতোমধ্যে ২২টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে এবং আরও ৩৫টি বন্ধের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি গেটম্যানবিহীন ৫৬টি বৈধ ক্রসিংয়ে দ্রুত গেটম্যান নিয়োগের প্রস্তাব রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে নতুন নির্মিত এই প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি থাকায় এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ উদ্বেগ ও প্রশাসনিক বক্তব্য বর্তমানে এই রুটে কক্সবাজার এক্সপ্রেস, পর্যটক এক্সপ্রেস, প্রবাল এক্সপ্রেস ও সৈকত এক্সপ্রেস-এই চার জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করছে। সামনে নতুন ট্রেন যুক্ত হলে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়বে, যা অনিরাপদ ক্রসিংগুলোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. সবুক্তগীণ বলেন, যানবাহনের চাপ নিয়ে চালানো জরিপ এবং রেলওয়ের নিজস্ব বিধিমালা অনুযায়ী অনুমোদনের ভিত্তিতে ক্রসিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সমস্যা হয় যখন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ অনেক সময় রাস্তা প্রশস্ত বা পাকা করে, কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে কিছু জানায় না।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, যেসব ক্রসিংয়ে যানবাহন চলাচল বেশি, সেখানে ব্যারিয়ার ও সার্বক্ষণিক গেটম্যান থাকা প্রয়োজন। বাঁক বা অন্য কারণে ট্রেন দেখা যায় না এমন স্থানেও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এবং রেলওয়ে পুলিশ সুপার তহুরা জান্নাত জানান, স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের যাতায়াতের সুবিধার্থে অপরিকল্পিতভাবে রেললাইনের ওপর অবৈধ পথ তৈরি করছেন। অসচেতন পারাপারই এসব দুর্ঘটনার বড় কারণ হওয়ায় সবাইকে সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তারা।