...|...|...

রাজশাহী

নিজের স্বপ্ন ছুঁয়ে, হাজারো নারীর ভবিষ্যত গড়েছেন নাসিমা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি
আপডেট: ২ ঘণ্টা আগে
নিজের স্বপ্ন ছুঁয়ে, হাজারো নারীর ভবিষ্যত গড়েছেন নাসিমা

মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে। অষ্টম শ্রেণিতেই থেমে যায় লেখাপড়া। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেই ভবিষ্যতের নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সেলাইয়ের হাতেখড়িই একসময় হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই দক্ষতাকে পুঁজি করে শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, স্বাবলম্বিতার পথ দেখিয়েছেন এক হাজারের বেশি নারীকে।

তিনি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের নাসিমা খানম। তার প্রতিষ্ঠিত মাদাই নূর মহিলা উন্নয়ন সংস্থা নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সেলাই প্রশিক্ষণ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি নূর-নাহিদ লেডিস টেইলার্স অ্যান্ড প্রশিক্ষণ সেন্টার থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী আজ আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।

নাসিমা খানম জানান, ছোটবেলায় তার মা বটি দিয়ে কাপড় কেটে ছোট বোনের জন্য পোশাক তৈরি করতেন। মায়ের সেই কাজ দেখেই সেলাইয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। পরে নিজেই কাঁচি দিয়ে কাপড় কেটে হাতে সেলাইয়ের মাধ্যমে পোশাক তৈরির চেষ্টা শুরু করেন। সেই ছোট্ট আগ্রহই একসময় তার জীবনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

অল্প বয়সে বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব বাড়লেও স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি। আর্থিক সংকট তাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। স্বামীর তখন কোনো স্থায়ী কাজ ছিল না। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নিজের দক্ষতাকেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই পথচলায় স্বামী শাশুড়ির উৎসাহ সহযোগিতা ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে ২০০৬ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নেন। পরে ক্রিস্টাল, পুঁথি পাথরের কাজ, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চতর উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। একই বছরের শেষ দিকে ২৫ জন নারীকে নিয়ে তিন মাসব্যাপী প্রথম প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিধি বাড়তে থাকে। এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নারী তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুনট গ্রামের কবিতা রানী বলেন, ‘নাসিমা আপার কাছে সেলাই শেখার পর আমার জীবন বদলে গেছে। আগে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন নিজের আয় দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতে পারি। তিনি শুধু সেলাই শেখাননি, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতেও শিখিয়েছেন।

নারী উন্নয়ন আত্মকর্মসংস্থানে বিশেষ অবদানের জন্য নাসিমা খানম উপজেলা, জেলা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা লাভ করেন। পরে রাজশাহী বিভাগ থেকে সফল আত্মকর্মী হিসেবে জাতীয় যুব পুরস্কার অর্জন করেন। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন বাংলাদেশ ট্রাস্ট তাকে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড-২০২৫ প্রদান করে।দুই সন্তানের জননী নাসিমা খানম বলেন, ‘আমি চাই গ্রামের প্রতিটি নারী কোনো না কোনো দক্ষতা অর্জন করুক। একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়ান, তখন শুধু তার জীবনই নয়, পুরো পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন হয়। যতদিন পারব, নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার কাজ করে যাব।

কালাই উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. শাহ আলম শেখ বলেন, ‘নাসিমা খানম যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি শুধু নিজের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেননি, তার প্রশিক্ষণে এক হাজারের বেশি নারী দক্ষতা অর্জন করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে তার অবদান অনুকরণীয়।