...|...|...

রংপুর

তিন বছরে ১১টি বাল্যবিয়ে ঠেকাতে কাজ করেছে ৬৬০ কমিটি

নীলফামারী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৮ আগস্ট ২০২৬, রাত ৮:৫৬ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬, রাত ৮:১৬
Shares
তিন বছরে ১১টি বাল্যবিয়ে ঠেকাতে কাজ করেছে ৬৬০ কমিটি

উঠান বৈঠক। ছবি: টাইমস টুডে

সরকারি হিসাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নীলফামারীতে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে ৬৬০টি কমিটি। কাগজপত্রে এসব কমিটির নিয়মিত সভা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও উঠান বৈঠক চলার কথা থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে বাল্যবিয়ে বন্ধে এদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গত তিন বছরে ৬৬০টি কমিটির যৌথ উদ্যোগে মাত্র ১১টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করার তথ্য সামনে এসেছে, যা জেলার সার্বিক বাল্যবিয়ে পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারী জেলায় ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১৮ বছরের নিচে এই হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও কেন বাল্যবিয়ে থামছে না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পারিবারিক অসচ্ছলতা, মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার ব্যয় বহনে পরিবারের অক্ষমতা এবং সচেতনতার অভাব বাল্যবিয়ে অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ। তবে এর চেয়েও বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে জন্মনিবন্ধনে জালিয়াতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্রের সহায়তায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত বয়স ১৮-র নিচে হলেও কাগজপত্রে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে অনায়াসেই বিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। যদিও মাঠপর্যায়ে তদারকির এই ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কমিটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুতর অভিযোগ। একটি কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাল্যবিয়ে বন্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে গেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সময়মতো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো কিছু ক্ষেত্রে কমিটির দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধেই মেয়ের পরিবারকে আইনি পথ এড়িয়ে কীভাবে বয়স বাড়িয়ে নেওয়া যায় তার বুদ্ধি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অল্প বয়সে বিয়ের কারণে জেলায় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট জটিল আকার ধারণ করছে। নীলফামারীর নারী ও শিশু বিষয়ক আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আসাদুজ্জামান খান রিনো জানান, বাল্যবিবাহের কারণে প্রতিনিয়ত নানা আইনি জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং আদালতের ওপর মামলার চাপ বাড়ছে। তিনি কেবল প্রশাসনিক অভিযান না চালিয়ে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।

অন্যদিকে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ইউ.এ. রওশন আরা ইসলাম বলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই গর্ভধারণের ফলে কিশোরীদের প্রসবজনিত জটিলতা এবং মা ও শিশুর জীবনঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।

বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসনের অভিযানকে অনেক সময় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বিয়ে ঠেকানোর পর ওই কিশোরীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও শিক্ষার দায়িত্ব কে নেবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। অসচ্ছল পরিবারের পক্ষে পড়ালেখার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়লে অনেক কিশোরী নিজের উদ্যোগে বিয়ে বন্ধ করেও আবারও একই ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির জেলা সভাপতি মো. নায়িরুজ্জামান জানান, জেলায় বাল্যবিবাহের হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না কমার পেছনে প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের কিছু বাস্তব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ চলছে।