...|...|...

ঢাকা

গেজেটে পদ নেই

ডাসার সরকারি মহিলা কলেজে ‘ইন্সট্রাক্টর’ হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে তোলপাড়

মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৪১ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৩২
Shares
ডাসার সরকারি মহিলা কলেজে ‘ইন্সট্রাক্টর’ হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে তোলপাড়

সরকারি গেজেটে পদটির উল্লেখ নেই, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনুমোদনও ছিল না—এরপরও মাদারীপুরের ডাসার সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ‘ইন্সট্রাক্টর, প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ পদে হুমায়ুন কবিরকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আরও বিস্ময়কর বিষয়, বর্তমানে ওই পদে কোনো ক্লাস না থাকলেও তাকে কলেজের বিভিন্ন কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি নির্মাণকাজের সাইট দেখাশোনার জন্য কলেজের তহবিল থেকে তাকে পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—অনুমোদনহীন পদে নিয়োগ হয়ে থাকলে তার চাকরির বৈধতা কী? আর সরকারি কলেজের তহবিল থেকে কোন বিধি ও খাতের আওতায় তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে?

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, তৎকালীন শেখ হাসিনা একাডেমি অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ জাতীয়করণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে। জাতীয়করণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ওই পরিপত্রে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ, পদোন্নতি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

এরপর ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হুমায়ুন কবিরকে ‘ইন্সট্রাক্টর, প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কলেজের একাধিক শিক্ষক দাবি করেছেন, ওই সময় ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে ‘প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ বিষয়েরই অনুমোদন ছিল না। ফলে অনুমোদনহীন বিষয়ের জন্য ইন্সট্রাক্টর পদে নিয়োগ কীভাবে দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনুমোদন, পদটি অনুমোদিত জনবল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না—এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইন্সট্রাক্টর হিসেবে নিয়মিত পাঠদান না করলেও হুমায়ুন কবিরকে কলেজের ডাইনিংয়ের কাজ দেখা, পরীক্ষার খাতা দেখা ও পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন, পদটি যদি অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে হয়, তাহলে কোন বিধি বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে তাকে কলেজের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। জাতীয়করণের পর তার চাকরির অবস্থান কী এবং তাকে দেওয়া অর্থ কোন খাতে দেখানো হচ্ছে, সেটিও তদন্ত হওয়া দরকার।

নিজের নিয়োগের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাকে প্রিন্সিপাল স্যার রেখেছেন। তিনি আমার কাজের জন্য টাকা দেন। আমার সাবজেক্ট নেই। আমাকে কেন নিয়োগ দেওয়া হলো—এ কারণে আমি হাইকোর্টে আপিল করেছি। এখন হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায় আছি।’

ডাসার সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘তার তো কোনো ক্লাস নেওয়া নেই। সে আমাদের কলেজের কনস্ট্রাকশন সাইটগুলো দেখে। এজন্য তাকে কিছু পারিশ্রমিক দিই।’

অধ্যক্ষের এই বক্তব্যের পরই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একজন ‘ইন্সট্রাক্টর’ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির কোনো ক্লাস না থাকলে তাকে নির্মাণকাজের সাইট দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়ার আইনগত ভিত্তি কী? আর এ কাজের জন্য কলেজের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার অনুমোদনই বা কোথায়?

হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে আরও কিছু অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের দাবি, তিনি দুটি কলেজ থেকে বেতন নেন। পাশাপাশি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি দেখাশোনার কাজও করেন এবং এ জন্য তার স্ত্রীর কাছ থেকে পারিশ্রমিক নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা ও তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে হুমায়ুন কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন অধ্যক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের দাবি, নিয়োগের নথি, অনুমোদন এবং জাতীয়করণের সময়কার সরকারি নির্দেশনা যাচাই করলেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

মাদারীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, ‘ওই কলেজে কোনো বিষয়ে যদি সাবজেক্ট না থেকে থাকে, তাহলে নতুন করে ওই সাবজেক্টের পদ সৃষ্টি করে, তারপরে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে তার থাকার কোনো সুযোগ নেই। এরকম কেউ হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

ফলে এখন মূল প্রশ্ন—অনুমোদিত বিষয় ও গেজেটভুক্ত পদ ছাড়াই কীভাবে নিয়োগ হলো, জাতীয়করণের প্রক্রিয়ার মধ্যে সেই নিয়োগের অনুমোদনই বা কোথায়, আর সরকারি কলেজের তহবিল থেকে কোন নিয়মে দেওয়া হচ্ছে পারিশ্রমিক? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, জনবল কাঠামো, সরকারি অনুমোদন এবং অর্থ প্রদানের হিসাব খতিয়ে দেখার দাবী উঠেছে।