জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা ভোটার আইডি কার্ডে নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা, স্বামী-স্ত্রীর তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের ভুল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তবে কোন তথ্য সংশোধন করা হচ্ছে, তার ওপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্ভর করে। সংশোধিত তথ্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি জমা দিতে হয়।
নাম সংশোধন
নামের বানান বা আংশিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত শিক্ষাগত সনদ, অনলাইন জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স (যদি থাকে) দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সন্তানের জন্মসনদ বা শিক্ষাগত সনদ, কাবিননামা কিংবা বিবাহ সনদ এবং স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডিও প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে।
তবে পুরো নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা হলফনামা চাওয়া হতে পারে। প্রয়োজন মনে করলে নির্বাচন কমিশন সরেজমিন তদন্তও করতে পারে।
বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন
বাবা বা মায়ের নামের বানান, পদবি কিংবা পুরো নাম সংশোধনের জন্য শিক্ষাগত সনদ, অনলাইন জন্মনিবন্ধন এবং বাবা-মায়ের এনআইডি প্রয়োজন হতে পারে। একই সাথে ভাই-বোনের এনআইডি ও শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সও সহায়ক নথি হিসেবে চাওয়া হতে পারে।
সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল, করের রশিদসহ অতিরিক্ত প্রমাণপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।
জন্মতারিখ সংশোধন
জন্মতারিখ সংশোধন তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও যাচাইসাপেক্ষ বিষয়। এ ক্ষেত্রে এসএসসি, জেএসসি বা পিএসসি সনদ, অনলাইন জন্মনিবন্ধন, ভাই-বোনের এনআইডি, ওয়ারিশ সনদ, কাবিননামা, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো নথি প্রয়োজন হতে পারে।
পরিস্থিতি অনুযায়ী সিভিল সার্জনের বয়স নির্ধারণ প্রতিবেদন, সার্ভিস বুক, এমপিও শিট বা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্রও চাওয়া হতে পারে। অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে পেনশন বই এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সনদ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর তথ্য
এনআইডিতে স্বামী বা স্ত্রীর নাম যোগ বা সংশোধনের জন্য কাবিননামা বা বিবাহ সনদ এবং স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডি প্রয়োজন হতে পারে। সন্তানের জন্মসনদ, এনআইডি বা শিক্ষাগত সনদও সহায়ক নথি হিসেবে জমা দেওয়া যায়।
দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু সনদ কিংবা তালাকনামার সাথে দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা দিতে হতে পারে। পুরো নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে হলফনামা, ওয়ারিশ সনদ, বিদ্যুৎ বিল বা করের রশিদসহ অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে।
জন্মনিবন্ধন নম্বর ও জন্মস্থান
জন্মনিবন্ধন নম্বর সংশোধনের ক্ষেত্রে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
জন্মস্থান পরিবর্তনের জন্য অনলাইন জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হতে পারে।
লিঙ্গ ও পেশা সংশোধন
লিঙ্গ সংশোধনের ক্ষেত্রে ভোটার নিবন্ধন ফরম (ফরম-২), মেডিকেল সনদ এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
পেশা সংশোধনের জন্য চাকরিজীবীদের নিয়োগপত্র, পেশাসংক্রান্ত সনদ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া যেতে পারে।
অন্যান্য তথ্য সংশোধন
দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন সংশোধনের ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার প্রতিবেদন ও মেডিকেল সনদ প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের গ্রুপ যোগ বা পরিবর্তনের জন্য রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার রিপোর্ট দিতে হয়।
এ ছাড়া এনআইডিতে টিআইএন নম্বর যোগ বা সংশোধনের ক্ষেত্রে টিআইএন সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি, ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বরের জন্য লাইসেন্সের সত্যায়িত কপি এবং পাসপোর্ট নম্বরের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের সত্যায়িত কপি প্রয়োজন হতে পারে।
ঠিকানা পরিবর্তনে যেসব কাগজ লাগে
স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা সংশোধনের জন্য অনলাইন জন্মনিবন্ধন, বিদ্যুৎ বিল, চৌকিদারি ট্যাক্স বা পৌর করের রশিদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া টিআইএন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্টের তথ্যও ঠিকানা যাচাইয়ে সহায়ক হতে পারে।
সংশোধনের আবেদন কোন ক্যাটাগরিতে পড়ে?
এনআইডি সংশোধনের আবেদন সাধারণত সংশোধনের জটিলতা ও প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো—
‘ক’ ক্যাটাগরি: সাধারণ ও তুলনামূলক সহজ সংশোধন
‘খ’ ক্যাটাগরি: অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন এমন আবেদন
‘গ’ ক্যাটাগরি: জটিল সংশোধন, যেখানে বেশি প্রমাণপত্র প্রয়োজন
‘ঘ’ ক্যাটাগরি: সবচেয়ে জটিল আবেদন, যেখানে বিস্তৃত তদন্ত ও যাচাই হতে পারে
বিশেষ করে জন্মতারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন তথ্যের মধ্যে পার্থক্য কতটা, তার ওপর আবেদনের জটিলতার ধরন নির্ধারিত হতে পারে।
আবেদনের আগে যা খেয়াল রাখবেন
এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সব নথির তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নথিতে একই তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে।
তাই যে তথ্য সংশোধনের আবেদন করা হবে, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকারি নথি প্রস্তুত রাখা উচিত। তবে সংশোধনের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত কাগজপত্র বা তদন্ত চাইতে পারে।


