দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সবুজ সোনার জোগানদাতা চা শ্রমিকেরা। কিন্তু যে শ্রমিকদের ঘামে এই শিল্প টিকে আছে, তাদের জীবনটাই আটকে আছে ১৮৫৪ সালের ব্রিটিশ আইনে।
প্রায় পৌনে দুই শ বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাগানে কাজ করেও আজও তারা ভূমির মালিকানা পায়নি। দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। মাস শেষে হাতে আসে ৩ হাজার ৬১০ টাকা। রাষ্ট্রীয় কোনো কাজে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে হয় উদ্বাস্তুর মতো।
মৌলভীবাজার সহ সিলেট বিভাগের ১৩২টি বাগানের প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার চা শ্রমিকের জীবন যেন আধুনিক যুগের ‘ক্রীতদাস’ প্রথারই বর্ধিত রূপ।
ব্রিটিশরা আসাম ও মৌলভীবাজার বাগানে কাজ করাতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শ্রমিক এনেছিল। চুক্তি ছিল ৫ বছরের। কিন্তু সেই ৫ বছর আজ ১৭০ বছরে গড়িয়েছে।
তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্ম এখন বাগানেই জন্মায়, বাগানেই বড় হয়। কিন্তু তাদের নিজস্ব জমি নেই। বাস করেন বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া লাইন নামের টিনের ঘরে। বেতন বন্ধ হলেই উচ্ছেদের ভয়।
মৌলভীবাজারের চা বাগানের শ্রমিক নেতা বলেন, আমরা এই মাটিতে ৭ প্রজন্ম ধরে আছি। কিন্তু এই মাটির এক ইঞ্চিও আমাদের না। এটা কি ক্রীতদাস প্রথা না।
২০২২ সালে আন্দোলনের পর দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা, পরে ১৮৭ টাকা হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে এই টাকায় একটি পরিবারের ১ সপ্তাহও চলে না।
চাল ১ কেজি ৭০ টাকা, তেল ১ লিটার ১৭০ টাকা, ঔষধ-সন্তানের পড়াশোনা বাদই দিলাম। মাসে ৩,৬১০ টাকায় ৪ জনের সংসার কীভাবে চলে। সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা রাষ্ট্রীয় কাগজপত্রে। বাগানের ঠিকানা স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গ্রহণ করে না অনেক দফতর।
চাকরি, পাসপোর্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় তাদের ভাসমান বা উদ্বাস্তু হিসেবে দেখা হয়। জন্ম-নিবন্ধন, এনআইডি করতেও পোহাতে হয় মাসের পর মাস। একজন শ্রমিকের ছেলে এসএসসি পাস করে চাকরির আবেদন করতে পারেনি শুধু পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জটিলতায়।
এখনও ৮-১০ ফুটের একটি ঘরে ৫-৬ জন মানুষ থাকে। নেই পাকা টয়লেট, নেই বিশুদ্ধ পানির লাইন। হাসপাতাল থাকলেও ডাক্তার-ঔষধের সংকট। প্রসূতি মায়েদের মৃত্যু, অপুষ্টি, চর্মরোগ এখানে নিত্য ঘটনা।
বাগানে প্রাথমিক স্কুল আছে। কিন্তু মাধ্যমিকের পর পড়ার সুযোগ নেই। কারণ কলেজে যেতে ভাড়া-খরচ লাগে। সেই সামর্থ্য নেই। ফলে মেধাবী সন্তানরাও বাবার মতো ১৮৭ টাকার শ্রমিক হয়েই বড় হয়। বংশপরম্পরায় দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তানভীর আহম্মদ বলেন, মজুরি নির্ধারণ হয় ত্রিপক্ষীয় কমিটিতে। বাগান মালিকরা লোকসানের কথা বলেন। তবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।
বাগান মালিক সমিতির নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চায়ের দাম কম। ভর্তুকি না দিলে বাগান টিকবে না। তবে তারা স্বীকার করেন, শ্রমিকদের জন্য ভূমি বন্দোবস্তের বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গল চা-বাগান পর্যটনের আকর্ষণ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ১ লাখ ২২ হাজার মানুষের আর্তনাদ। যে হাতে আমরা চায়ের কাপ তুলি, সেই হাতের মালিকরা আজও আধুনিক যুগের ক্রীতদাস।



