এক কেজি মাল্টা ৫৫০ টাকা। গত দুই মাস ধরে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হচ্ছে এই ফল। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী, আমদানিতে প্রতি কেজি মাল্টার ক্রয়মূল্য মাত্র ৮৭ টাকা। আমদানি শুল্ক, পরিবহন খরচ ও মুনাফা মিলিয়ে প্রতি কেজি মাল্টার সর্বোচ্চ খরচ হওয়ার কথা ২১০ টাকা। অর্থাৎ খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কোনোভাবেই ২৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
সরবরাহ সংকটের কারণে মাল্টার দাম বেড়েছে—এমন যুক্তি দেওয়া হলেও নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে অন্তত ২২ শতাংশ বেশি মাল্টা আমদানি হয়েছে। তাহলে সরবরাহ সংকটের এই যুক্তি কতটা যৌক্তিক—এমন প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, গত দুই মাসে অসাধু সিন্ডিকেট জনগণের পকেট থেকে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা জানান নাহিদ ইসলাম।
পোস্টে তিনি বলেন, ১২০ টাকার পোলাওয়ের চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়। অথচ সুগন্ধি চাল সম্পূর্ণ দেশেই উৎপাদিত হয়। ফলে কোনো যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব এই পণ্যের দামে পড়ার কথা নয়। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
বিদেশে রপ্তানির কারণে পোলাওয়ের চালের দাম বেড়েছে—এমন যুক্তিরও সমালোচনা করেন নাহিদ। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে রপ্তানি শুরুর পর সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে ২০২৫ সালে। তখনও এর দাম ১২০ টাকার বেশি ছিল না। তার হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসে শুধু পোলাওয়ের চাল থেকেই আনুমানিক দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
ডিমের দাম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে প্রতি ডজন ডিমের গড় দাম ছিল ১২০ টাকা। এখন সেই ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। দরিদ্র মানুষের প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস একটি ডিম কিনতে এখন ১৫ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
মুরগির খাবারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেওয়া হলেও যে হারে খাবারের দাম বেড়েছে, তাতে প্রতিটি ডিমের দাম এক টাকার মতো বাড়ার কথা। অথচ বেড়েছে পাঁচ টাকা। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিমের বাড়তি দামের কারণে জনগণের পকেট থেকে অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি টাকা চলে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকার কয়েক দফায় বাড়িয়েছে। এরপরও প্রতিটি সিলিন্ডারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত এক হাজার টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। সরকার বলছে, আমদানি পর্যাপ্ত। তাহলে প্রতিদিন অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা কার পকেটে যাচ্ছে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চাল, আটা, তেল, চিনি, মুরগি, মাছ, সবজিসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ১৬০ টাকায় রেখে যাওয়া ব্রয়লার মুরগির কেজি এখন ২০০ টাকা। কয়েক দিন আগেই বেড়েছে দুধের দাম। মানুষের আয় বাড়েনি, অথচ প্রতিনিয়ত বেড়েছে বেঁচে থাকার খরচ।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়েছিল দেশের মানুষ। কিন্তু নির্বাচনের পর কার মদদে, কার ইন্ধনে সেই সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তা জানতে চান তিনি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির কারণে এমনিতেই দেশবাসী হাঁসফাঁস করছে বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ। এর মধ্যে আবারও ফ্যাসিবাদী আমলের মতো সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে দেশের মানুষ বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ লুটের এই বন্দোবস্ত অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, এ দেশের মানুষের জীবন নিয়ে আর কোনো অপশক্তিকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া যাবে না।


