দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারি মজুত বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন। একই সাথে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ মজুতের সীমাও পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২২ লাখ ১০ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন। ৯ সেপ্টেম্বর সেই মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ ছয় মাসে মজুত বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন।
বর্তমান মজুতের মধ্যে চাল রয়েছে ২০ লাখ ৩৬ হাজার ১০২ মেট্রিক টন, গম ২ লাখ ৩২ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন এবং ধান ৩৪ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। ফ্লোটিং মজুতসহ মোট মজুতের পরিমাণ ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ফ্লোটিং মজুত হিসেবে গম রয়েছে ৬৮ হাজার ৭২৩ মেট্রিক টন।
সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে দেশের সরকারি খাদ্যগুদামগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই সক্ষমতা ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে দেশের নিরাপদ খাদ্য মজুতের প্রচলিত সীমাও বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন মজুতকে নিরাপদ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও জনসংখ্যা ও খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা ১৬ লাখ মেট্রিক টন নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য মজুতের বর্তমান পরিস্থিতি আগের সময়ের তুলনায়ও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তির সময় সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২১ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ছিল ১৯ লাখ ৫৪ হাজার এবং গম ১ লাখ ৭৭ হাজার মেট্রিক টন।
সেই হিসাবের সাথে তুলনা করলে বর্তমানে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বেড়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে একই সময়ে দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। সে হিসাবে বর্তমান মজুত প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টন বেশি।
চলতি বোরো সংগ্রহ কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো সংগ্রহে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ধান ও চাল মিলিয়ে মোট ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ধান ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন, সিদ্ধ চাল ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬৮ মেট্রিক টন এবং আতপ চাল ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৩ মেট্রিক টন। পাশাপাশি ৫২৩ মেট্রিক টন গমও সংগ্রহ করা হয়েছে।
খাদ্য মজুত আরও শক্তিশালী রাখতে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৬৫ হাজার ৮৬০ এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য এসেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন, সংগ্রহ, আমদানি ও সংরক্ষণ—সব দিক সমন্বয় করেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চলছে। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ শাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রম সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে। সরকারি গুদামে বর্তমানে চাল ও গমের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং ওএমএসসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে খাদ্য বিতরণ চালু রাখতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, জনসংখ্যা ও জাতীয় খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
তিনি জানান, এবার দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়ে সরকার আশাবাদী। ফলে বোরোর মতো আমন সংগ্রহেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জনের প্রত্যাশা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় গমের পরিবর্তে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে চাল ব্যবহারের বিকল্প পরিকল্পনাও রয়েছে।
খাদ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন জানান, দেশের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুতের পাশাপাশি খাদ্যের গুণগত মান ও সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখতে গুদাম থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান মজুত প্রচলিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি। ভবিষ্যতের খাদ্য চাহিদা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।


