...|...|...

জাতীয়

হাসনাতের যে প্রশ্নে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে হট্টগোল

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, রাত ৮:২৭ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৩৩
Shares
হাসনাতের যে প্রশ্নে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে হট্টগোল

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শুরুর দিনই উত্তপ্ত হয়ে উঠে জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধী দলের আপত্তি, হইচই, হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট সংসদে কার্যত অচলাবস্থা থাকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন কি না, এমন প্রশ্ন রাখেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি কোনো প্রশ্ন হয়েছে, নাকি পল্টনের বক্তৃতা- তা তিনি বুঝতে পারেননি।’

সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনকালে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা এবং নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে একটি সাংস্কৃতিক জেলা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ওই জেলায় গান-বাজনা ও সিনেমা প্রদর্শনী প্রায় বন্ধ। গত ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন রিস্টোর’ করতে পেরেছেন কি না, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না এবং তিনি ব্যর্থ হয়েছেন কি না- সেই প্রশ্ন রাখেন এই সংসদ সদস্য। এছাড়া তিনি বক্তব্যে বিভিন্ন হত্যা ও আহতের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা- বুঝতে পারিনি।’ তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ছয় মাসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সফল হয়েছেন কি না, এটি একটি প্রশ্ন; আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সিনেমা হল কেন নেই, সেটি আরেকটি প্রশ্ন। এছাড়া সংসদ সদস্য যে হত্যা ও জখমের পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা কীসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে- সে বিষয়ে তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতার আনা হয়েছে। রংপুরের সাম্প্রতিক চারটি হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এখানে কোথায় কী ব্যর্থতা আছে, বলতে হবে। আইন রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে বা এই সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারেনি- এগুলো বক্তব্যে চলে। এটা সংসদ। সংসদে তথ্যভিত্তিক কথা বলতে হবে।’

কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলে সংসদে এ নিয়ে বিতর্ক করা যাবে এবং সংসদ সদস্যরা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কথা উল্লেখ করলে ৩০০ বিধিতে সে বিষয়ে বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

এর আগে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে অভিযোগ করেন, দিনে–দুপুরে ছিনতাই হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা হচ্ছে, এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে যাচ্ছেন, তাকে কেন্দ্র করে ভুয়া স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের সদস্যের ওপর হামলার মামলায় আসামি গ্রেফতার না করে মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলের নেতা–কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রথম এক মিনিট অমনোযোগী ছিলেন। তাই তিনি প্রশ্নটি আবার করার অনুরোধ করেন।

পরে শফিকুল ইসলাম মাসুদ আবার প্রশ্নটি করেন।

জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’

এ বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তারা হইচই করতে থাকেন। অনেকে আসন থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।

এর আগে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।’

হাসনাতের প্রশ্নের জবাবের সময় কয়েকজন মৃদু আপত্তি জানালেও শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাবের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান বিরোধী দলের সদস্যরা।

বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তির মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি কাউকে উদ্দেশ করে বলেননি। তারপরও বিরোধী দলের সদস্যরা হট্টগোল করতে থাকলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আপনার শেল্টার (আশ্রয়) চাইছি।’

বিরোধী দলের হইচইয়ের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একপর্যায়ে বলেন, তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করছেন। এরপরও বিরোধী দল প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। হট্টগোলের মধ্যে কথা বলতে না পেরে এক পর্যায়ে বসে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

অন্যদিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের সদস্যদের বারবার বসার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার অনুরোধ করেন।

একপর্যায়ে স্পিকারকে বারবার বলতে শোনা যায়, ‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, হয়েছে তো, অনেকক্ষণ বলেছেন। এখন আপনারা অনুগ্রহ করে বসুন। অনুগ্রহ করে নিজের আসনে বসুন।’

কিন্তু বিরোধীদলের সদস্যরা কেউ স্পিকারের কথা আমলে না নিয়ে হইচই করতে থাকেন। স্পিকার তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘এইভাবে ঢালাও না বলে মাইকে বললে তো সবাই শুনতে পায়। আপনাদের সুযোগ দেওয়া হবে। যখন সুযোগ পাবেন, মাইকে বলবেন।’

স্পিকার বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছেমতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ (সমালোচনা) করতে পারছেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, বসুন প্লিজ। অপেক্ষা করুন।’ একপর্যায়ে স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ার পর তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেবেন।

বিরোধী দলের হইচইয়ের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করেন। তখন স্পিকার তাকে তার (স্পিকার) দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। বিরোধী দলের সদস্যরা তখনো দাঁড়িয়ে হইচই করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। তাদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধী দলের নেতাকে দেব।’

পরে হট্টগোলের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোথায় ছিনতাই হয়েছে, আসামি গ্রেফতার হয়নি- এগুলো ঢালাও না বলে সুনির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করতে হবে। সে জন্য তিনি বলেছেন এটা জাতীয় সংসদ।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে সুযোগ দেন স্পিকার। বক্তব্যের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাকে আগে সুযোগ দিলে ওনার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কথাটা শুনতে পেতাম।’

এ সময় সরকারি দলের সদস্যদের কেউ কেউ বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে কিছু বলতে থাকেন।

তখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘বক্তব্য কি আপনি দেবেন, না আমি দেব? আপনি দেন।’

স্পিকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এটা অশুভ। আমার বক্তব্যের সময় যদি এভাবে কমেন্টস করা হয়, তাহলে আমার এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।’

তখন স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি সম্মানিত সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, আজকে নতুন করে তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন নাই। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন সবাইকে। উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এমনকি তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সেই দুঃসাহস এখানে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন, ওখানে যার পছন্দ গিয়ে ভর্তি হবে ওনার লেকচার শুনবে।’

আজকে একই বক্তব্যে দুবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাটাক করে ফেললেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার সঙ্গীরা তো মনে করে, আমি নিজেও মনে করি যে এইটা কালচারাল না, এইটা পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম। এটা হওয়া উচিত না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ এবং তার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এইটুকু করা হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে থাকবে, না হলে অপমান নিয়ে এখানে বসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যকে সমর্থন জানান।