বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের খাবার জোগাতে প্রতি বছরই জমিতে সারের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষি পণ্যের সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সড়ক আটকে বিক্ষোভ হয়েছে আবার কোথাও ঘটেছে লুটপাটের ঘটনা।
এমন প্রেক্ষাপটে সার নিয়ে ভবিষ্যৎ সংকট থেকে বাঁচার জন্য এখন ‘ন্যানো ফার্টিলাইজার’ বা অণু সারের দিকে তাকাচ্ছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। যা বৈশ্বিক কৃষিতে চতুর্থ বিপ্লব হিসেবেই পরিচিতি পাচ্ছে। তারা বলছেন, গেল দুই দশকে কৃষি জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপির মতো প্রচলিত রাসায়নিক সারের ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো কৃষি নির্ভর দেশগুলোকে, একদিকে অতিরিক্ত চাহিদার যোগান দিতে বাড়তি খরচে সার আমদানি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত সারের ব্যবহারে মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া সারের অপচয়, উৎপাদন খরচ এবং পরিবেশ দূষণের মাত্রাও বাড়ছে।
কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বব্যাপি গত দুই দশকে অন্যান্য খাতের মতো কৃষিতেও ন্যানো টেকনোলজির ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্য, সার উৎপাদনের দিকেও নজর দিয়েছে বিশ্বের উন্নত অনেক দেশ। ফলে সার উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তারা। যদিও এখনও এই তৎপরতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ।
কৃষি বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, ন্যানো ফার্টিলাইজারের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সার আমদানি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
ন্যানো ফার্টিলাইজার হলো নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম সহ অনুখাদ্য যেমন দস্তা, লোহা, বোরনকে ন্যানো-আকারে তৈরি সার। ন্যানো মানে- ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার। সাধারণত সারের দানা খালি চোখে দেখা যায়। কিন্তু ন্যানো ফার্টিলাইজার এর কণা এত ছোট হয় যে, এক লিটার পানিতে ৫০০ মিলিয়ন পর্যন্ত কণা মেশানো সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ন্যানো ফার্টিলাইজার এর তিনটি বিশেষ গুণ রয়েছে। এর আকার ছোট হওয়ায় ফসলের পাতা কিংবা শেকড়ের সংস্পর্শে আসার জায়গা অনেক বেশি। ন্যানো কণাগুলোকে পলিমার বা ক্লে দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ফলে এই সার ৪০ থেকে ৫০ দিন ধরে ধীরে ধীরে গাছকে খাবার দেয়। যা একবার স্প্রে করলেই যথেষ্ট। পাতায় ন্যানো ফার্টিলাইজার স্প্রে করলে স্টোমাটা বা ছিদ্র দিয়ে সরাসরি গাছের ভেতরে ঢুকে যায়। আর মাটিতে দিলে শেকড় সহজেই টেনে নিতে পারে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত দুইটি পণ্য হলো, ন্যানো ইউরিয়া এবং ন্যানো ডিএপি। এগুলো সাধারণত তরল আকারে বোতলে পাওয়া যায়। কৃষি বিজ্ঞানীদের অনেকেই বলছেন, সাধারণ হিসেবে- ৫০০ মিলি ন্যানো ইউরিয়া এক বস্তা বা ৪৫ কেজি ইউরিয়ার সমান নাইট্রোজেন দিতে সক্ষম। ভারত, চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষি উৎপাদনে ন্যানো ফার্টিলাইজার ব্যবহার শুরু হয়েছে বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।
২০১২ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ন্যানো টেকনোলজির একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন থেকেই কৃষিতে ন্যানো টেকনোলজির ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু হয়। যার প্রতিফলন ঘটেছিল ২০১৮ সালে প্রণিত জাতীয় কৃষি নীতিতে। যেখানে কৃষি খাতে ন্যানো ফার্টিলাইজার, ন্যানো পেস্টিসাইড এবং ন্যানো সেন্সর এর ব্যবহার ও প্রসারের বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করা হয়। কিন্তু জাতীয় নীতিতে থাকলেও বাংলাদেশের কৃষিতে বাস্তবিকভাবে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও খুব একটা সম্ভব হয়নি।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, জাতীয় নীতিতে স্থান পেলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতি সহায়তা না থাকায়, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গবেষণা হলেও কৃষিতে ন্যানো টেকনোলজির ব্যবহার খুব একটা এগোইনি। এমনকি সফল গবেষণার পরও কোনো পণ্য বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়াও তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা গবেষণা করে একটা ন্যানো ফাঙ্গিসাইড তৈরি করলাম যেটা টক্সিক না কিন্তু সূর্যের আলোতে অ্যক্টিভেটেড হয়ে বাতাসের অক্সিজেন এবং আদ্রতা ব্যবহার করে সুপার অক্সাইড তৈরি করে, যা ফাঙ্গাসের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সমস্যা হলো কমার্শিয়ালি এমন কোনো ইন্ডাস্ট্রি নাই, যারা এটা উৎপাদন করবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান বলেন, বিদেশ থেকে সার আমদানির ক্ষেত্রে যে ভর্তুকি বাংলাদেশে দিচ্ছে ন্যানো ফার্টিলাইজারে গেলে সেটি কমানো সম্ভব। আমদানি করার ইউরিয়ার ২৫ শতাংশও যদি সেইভ করা যায় তাহলে প্রায় পাঁচ হাজার টন ইউরিয়ার অর্থ বাঁচানো সম্ভব।
তিনি বলেন, এখানে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে। সরকার যদি একটু নজর দেয় এখানে, পলিসি সাপোর্ট বা অর্থনৈতিক সাপোর্ট দেয় তাহলে আরও এক্সপেরিমেন্টের সুযোগ আছে।
বাংলাদেশের মতো স্বল্প জমি, উচ্চ জনসংখ্যা ও সারের ওপর ভর্তুকিনির্ভর দেশের জন্য ন্যানো সার গেম-চেঞ্জার হতে পারে বলেই মনে করছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এই ধরনের সার ব্যবহারের ফলে কৃষি উৎপাদন চার গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। যেখানে প্রচলিত ইউরিয়ার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ফসল গ্রহণ করতে পারে। বাকি ৬০ শতাংশ বাতাসে উড়ে যায় বা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়। সেখানে ন্যানো সারের দক্ষতা বা ফসলের গ্রহণ সক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
এতে করে একই ফলনের জন্য অর্ধেকেরও কম সার প্রয়োজন হবে। ফলে সার উৎপাদন বা আমদানিতে সরকারের ভর্তুকি কমবে। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের কারণে মাটি এবং পানির যে ক্ষতি হচ্ছে সেটিও কমবে বলেই মনে করেন কৃষি ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা।
প্রচলিত ইউরিয়া সারের তুলনায় ন্যানো ইউরিয়া পরিমাণে কম ব্যবহার হওয়ার ফলে মাটি এবং পরিবেশের ক্ষতিও কম হবে বলেই মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ২০২০ সালের পর থেকেই মূলত ন্যানো সার ব্যবহারের প্রবণতা খানিকটা বেড়েছে। যার বেশিরভাগই তরল আকারে। এছাড়া বায়োচার কোটেড অর্থাৎ বিশেষ পদ্ধতিতে উচ্চতাপে কাঠের গুড়ি ব্যবহার করে দানা আকারে তৈরি ইউরিয়া সার নিয়েও গবেষণা চলছে। এক্ষেত্রে একেক ধরণের সারের মাটিতে ক্ষতির প্রভাব একেক রকম হওয়ায়, এর নির্দিষ্ট মাত্রা বলা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, বায়োচার কোটেড হওয়ার কারণে এটি মাটির জন্য অবশ্যই ভালো হবে। এই ধরনের কাজ গোটা বিশ্বেই খুব কম হয়েছে। আমাদের এখানে যে কাজটি হচ্ছে, সেটার ট্রায়ালটা দেওয়ার পরই আসলে বলা যাবে যে মাটিতে ইমপ্যাক্ট কী হলো।
বাংলাদেশে ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা না হলেও পৃথকভাবে এ নিয়ে কাজ করছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট- ন্যানো ইউরিয়া ও ন্যানো জিংকের মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষাও করছে।
ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান। তিনি বলেন, ন্যানো সার ধীরে ধীরে মুক্তি পাওয়ায় তা মাটিতে জমে না, নদীতেও যায় না। ফলে অপচয় কম হয় এবং উৎপাদন খরচও কমে।
বায়োচার কোটেড ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ করছেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক। তিনি বলেন , তরল অবস্থায় থাকা ন্যানো সারের থেকেও কার্যকর হতে পারে বায়োচার কোটেড অবস্থায় থাকা ন্যানো সার। এক্ষেত্রে নরমাল ন্যানো ইউরিয়ার তুলনায় বায়োচার কোটেড ন্যানো ইউরিয়া আরও বেশি সময় ধরে রিলিজ হয়। ফলে অপচয় এবং দূষণ আরও কম হয়।
কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, ন্যানো সিলিকন ও ন্যানো জিংক গাছের কোষকে শক্ত করে। ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় এর ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
তাদের মতে, একজন কৃষককে বছরে তিন থেকে চারবার ইউরিয়া ছিটাতে হয়। ন্যানো ইউরিয়া সার দুইবার স্প্রে করলেই হয়। এতে শ্রমিক খরচ ও সময় দুটোই বাঁচবে। এ ছাড়া গমে ন্যানো জিংক স্প্রে করে ফলন ৮ থেকে ১২ শতাশ পর্যন্ত বাড়ানে গেছে। ভুট্টায় ন্যানো বোরন স্প্রে করলে দানা পুষ্ট হয়।
টমেটো, আলু, মরিচ ও আমে ন্যানো স্প্রে করে কৃষকরা কীটনাশক ও সারের খরচ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো গেছে বলেও প্রাথমিক জরিপে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানো সারের উৎপাদন ও পরিবহনে কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমনো সম্ভব। এ ছাড়া নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাসও কম নির্গত হয়।
বাংলাদেশে ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে গবেষণা এবং এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ন্যানো টেকনোলজিতে এখনও খুব একটা এগোতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে গবেষণায় প্রযুক্তিগত নানা ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া কৃষি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হলেও সরকারি পর্যায়ে নীতি সহায়তার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ নেই বলেও মনে করে বিশেষজ্ঞরা।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশে বহু আগে থেকেই ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্রে ন্যানো টেকনলজি নিয়ে কাজ হচ্ছে কিন্তু বায়োলজিতে ন্যানো ম্যাটেরিয়ালের কাজ খুব একটা হয়নি। এছাড়া ন্যানো ফার্টিলাইজার দিয়ে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে নাইট্রোজেনের যে পুরো চাহিদা সেটি পূরণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, আমাদের রাইসের যে নাইট্রোজেন চাহিদা, ন্যানো দিয়ে সেটি পূরণ করা সম্ভব নয়। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দিতে পারবে হয়তো। কারণ এই পরিমাণ ন্যানো উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন বড় ব্যাপার। ফলে প্রচলিত সারের পাশাপাশি এটা রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া ন্যানো সার জনপ্রিয় হলেই বাজারে নকল তরল বোতল বের হবে। এতে ফলন না হলে কৃষক পুরো প্রযুক্তির উপর আস্থা হারাবে। সরকারের শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব দরকার।
তথ্যসূত্র- বিবিসি বাংলা

