...|...|...

সারাদেশ

সাংবাদিক আলিফ হত্যা, তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:০৯
Shares
সাংবাদিক আলিফ হত্যা, তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ। ছবি: সংগৃহীত

কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো পাগলের ছদ্মবেশে সীমান্ত এলাকার অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করতেন লুৎফর জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকির। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সীমান্তের অপরাধী চক্রের সদস্যদের বিষয়ে তথ্য দিতেন তিনি। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতেও বিভিন্ন ছদ্মবেশে ঘুরতেন। পরে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজে অপরাধীদের নানা কর্মকাণ্ডের তথ্য প্রকাশ করতেন। এসব কর্মকাণ্ডের জেরেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।

আলিফ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে সীমান্ত এলাকার দুই শুটারের দুই স্বজনকে আটক করেছে পুলিশ ও এসবিআর। তাদের দুজনকেই রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ, পিবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার ছায়া তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুরের শুটার শামীম ও কিলার তাজুলকে ঘিরে তদন্ত চলছে। শামীমের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিভিন্ন থানায় ২৫ থেকে ৩০টি মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া সুব্রত সাংমা নামের সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যানকে হত্যা এবং পরে দা দিয়ে মজিবর নামের এক চোরাকারবারিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় শামীমের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। কিছুদিন কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান।

দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, চোরাচালান ও হত্যাসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তাজুল ইসলাম অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

২০১২ সালে একটি অস্ত্র মামলায় তাজুলের ১০ বছরের বেশি সাজা হয়। এরপর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন এবং সীমান্ত এলাকায় আরও বড় অপরাধী চক্র গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতারে গোয়েন্দা সংস্থাকে তথ্য দিতে মাঠে নামেন আলিফ ফকির। সে সময় তিনি মূলত গোয়েন্দা নজরদারির কাজে সহায়তা করতেন।

বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে সাবেক সেনা ও র‌্যাবের গোয়েন্দা পরিচয় দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল তৎকালীন র‌্যাব, বর্তমানে এসবিআর, বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ তাজুলকে আটক করে। পরে অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়।

জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই আলিফের সাথে তাজুলের বিরোধ শুরু হয় বলে জানা গেছে। পরে আলিফ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা শুরু করেন। ধর্ষণসহ দুটি মামলায় আটক হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি রূপসী বাংলা আইপি টিভির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে থাকেন। এ সময় তাজুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনার আংশিক তথ্য নিজের পেজে প্রকাশ করেন তিনি।

এরপর দুর্গাপুরের পানমহলের কাছে এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। জানা যায়, আলিফের চেহারার সাথে মিল থাকায় ভুলবশত ওই পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তাজুলের ভাতিজা সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে (২৩) আটক করে পুলিশ। তার স্বীকারোক্তিতেও এ তথ্য উঠে আসে বলে জানা গেছে।

এর কিছুদিন পর শিবগঞ্জ ঘাটে আলিফের ওপর হামলা হয়। তবে এসব ঘটনায় তাজুল, শুটার শামীম কিংবা অন্য কারও বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি আলিফ। নিজের ফেসবুক পেজ বা গণমাধ্যমেও তাদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। তবে বিভিন্ন ফোরামে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা জানাতেন এবং আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশকে তাগাদা দিতেন।

গত ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় স্ত্রী অনিন্দিতা সাংমার বাড়ির পাশে দুর্বৃত্তদের ছয়টি গুলিতে নিহত হন আলিফ। পরদিন ১৬ অক্টোবর তার স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর ১৭ অক্টোবর রাতে তাজুলের ভাতিজা অপূর্বকে আটক করা হয়। দুই দফায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, ২০ অক্টোবর শুটার শামীমের ভাগনে ও কিশোর গ্যাং নেতা আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে (২১) আটক করে দুর্গাপুর থানায় হস্তান্তর করে এসবিআর। পরে তাকেও তিন দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, একবারে হত্যার মূল হোতাদের কাছাকাছি চলে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আসামিরা সীমান্ত পার হয়ে যাওয়ায় সময় লাগছে।