মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, সংকট ও পরীক্ষা আসবেই। কখনো অর্থনৈতিক সমস্যা, কখনো অসুস্থতা, কখনো প্রিয়জন হারানোর কষ্ট কিংবা নানা ধরনের বিপদ মানুষকে দুর্বল করে দেয়। তবে একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, কোনো বিপদই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয় এবং প্রতিটি কঠিন সময়ের পরেই রয়েছে স্বস্তির সম্ভাবনা।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিপদের সময় আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা এবং তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা।
১. ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া
বিপদের সময় মানুষের প্রথম কাজ হওয়া উচিত হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। কারণ ধৈর্য মুমিনের অন্যতম বড় গুণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সুরা আল-বাকারা: ১৫৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কঠিন পরিস্থিতিতে শুধু পার্থিব উপায় অনুসন্ধান নয়, বরং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করাও জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও এর বহু উদাহরণ রয়েছে। মক্কার কঠিন পরিস্থিতি, তায়েফের নির্যাতন কিংবা বিভিন্ন যুদ্ধের সংকটে তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা করেছেন।
মুমিন যখন বিপদে পড়ে, তখন নামাজ তার জন্য আত্মিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে। নামাজের মাধ্যমে সে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।
২. বেশি বেশি দোয়া করা ও আল্লাহকে স্মরণ করা
বিপদের সময় একজন বান্দার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো দোয়া। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ডাক শুনেন এবং তাদের প্রার্থনা কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, “আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সুরা গাফির: ৬০)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন বলো—আমি তো নিকটেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৬)
বিপদের সময় কিছু বিশেষ দোয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। যেমন—“লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন।”
অর্থ: “আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)
হজরত ইউনুস (আ.) বিপদের মুহূর্তে এই দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন।
তাই বিপদের সময় শুধু মানুষের কাছে অভিযোগ না করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা, ইস্তিগফার করা এবং তাঁকে স্মরণ করা মুমিনের জন্য মুক্তির পথ হতে পারে।
৩. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা (তাওয়াক্কুল)
বিপদের সময় অনেক মানুষ ভয় ও দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো—চেষ্টা করতে হবে, তবে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (সুরা আত-তালাক: ৩)
তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন পাখিদের দেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে।”
(জামে আত-তিরমিজি)
এই হাদিসে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি চেষ্টা করাও জরুরি।
বিপদের সময় আরও যেসব আমল করা যেতে পারে।
ইস্তিগফার করা
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া বিপদ দূর হওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন।” (সুরা নুহ: ১০-১২)
কোরআন তিলাওয়াত করা
কোরআন মানুষের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সুরা আর-রাদ: ২৮)


