বাজারে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের ঝুঁকি নিয়ে প্রায়ই সতর্ক করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। পরীক্ষাগারে নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি মসলা, ঘিসহ কয়েকটি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নিম্নমানের পণ্য কেনা থেকে ভোক্তাদের সতর্ক করতে নিয়মিত অভিযান ও প্রচারণা চালানো হলেও প্রশ্ন থেকেই যায় একজন সাধারণ ক্রেতা কীভাবে বুঝবেন কোনো পণ্য মানসম্মত কি না?
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষ করে প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য কেনার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করলেই ভোক্তা প্রাথমিকভাবে পণ্যের বৈধতা ও মান সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যটি আসল ও অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে।
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হকও কিউআর কোডের গুরুত্বের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আসল পণ্যের কিউআর কোড স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট পণ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। নকল পণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত এসব তথ্য পাওয়া যায় না।
প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য কেনার সময় মোড়কে থাকা তথ্যগুলোও ভালোভাবে দেখা উচিত। আইন অনুযায়ী, পণ্যের নাম, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা, ওজন, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ব্যবহৃত উপাদানের তথ্য উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক।
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, এসব তথ্য না থাকলে পণ্যটি নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এ ছাড়া প্যাকেটের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের জন্য প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য যথাযথভাবে সিল করা এবং বায়ুরোধী হওয়া প্রয়োজন। ঢিলেঢালা বা এমন প্যাকেট, যার ভেতরে সহজেই বাতাস ঢুকতে পারে, তা নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের মতে, তুলনামূলকভাবে সুপারশপগুলোতে পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়। ফলে সেখানে অনুমোদিত বা আসল পণ্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তিনি বলেন, তবে বাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড বা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি বেশি।
বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান পূরণ করলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের লাইসেন্স দেওয়া হয়। পরে কোনো লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য নির্ধারিত মান থেকে বিচ্যুত হলে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজেদের পণ্য সংশোধন করে পুনরায় পরীক্ষার জন্য বিএসটিআইয়ের কাছে আবেদন করতে পারে। এরপর সংস্থাটি আবার পণ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। মান ঠিক থাকলে তা পুনরায় বাজারজাতের সুযোগ পায়।
তবে প্রত্যাহারের নির্দেশের পরও কোনো দোকানে সেই পণ্য পাওয়া গেলে দোকান মালিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বিএসটিআই মহাপরিচালক।
বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৩টিতে তাদের কার্যালয় রয়েছে। ফলে জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো দেশে নিবিড়ভাবে নজরদারি করা কঠিন বলে স্বীকার করেছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক।
তিনি বলেন, দেশের বিশাল পরিসরে কোথায় কোন পণ্য বিক্রি হচ্ছে, সব জায়গায় গিয়ে তদারকি করা কঠিন।
লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হলে সেটিকে বেআইনি হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারখানা সিলগালা, জরিমানা ও মামলা করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিএসটিআইয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন, নকল, অনুমোদনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বাজারজাতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালে দুই দফায় পরীক্ষার পর ৭০টির বেশি পণ্যকে নিম্নমানের ঘোষণা করে বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরের বছরও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৪৩টি পণ্যের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করেন, দেশে ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের পণ্যের বিস্তার ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।





